প্রবাদ আছে, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। সঠিক লক্ষ্য, অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে বয়স কখনোই সফলতার পথে বাধা হতে পারে না—এ কথাই যেন প্রমাণ করেছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর। জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ৫৪ বছর বয়সে এসে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ৩৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
আলী আকবরের ডাকনাম আলী আজম। তিনি নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। চাকরির সুবাদে রাজশিয়ায় অবস্থানকালে নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখা থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি।
আলী আকবর জানান, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে একসময় পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। পরে বিয়ে করেন। তার এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে একসময় আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন আলী আকবর। পরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনের অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করান। বড় মেয়েকে নার্স এবং ছোট ছেলেকে এমবিবিএস ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বর্তমানে তার ছেলে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।
সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পর তাদের বিয়ে-শাদিও দিয়েছেন আলী আকবর। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্ত্রীকে নিয়ে এখন সুখে সংসার করছেন। এরই মধ্যে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবারও তার পড়াশোনার ইচ্ছা জাগে। আর সেই ইচ্ছাকে আর দমিয়ে না রেখে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
আলী আকবর বলেন, পড়াশোনার জন্য কোনো বয়স লাগে না। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে প্রয়োজন শুধু মনোবল ও মনোযোগ। বর্তমান শিক্ষার্থীদের অযথা মোবাইল গেম ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মনে করেন, চেষ্টা ও মনোযোগ থাকলে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
তার পরিবারের সদস্যরাও বাবার এই সাফল্যে গর্বিত। ছেলে ডাক্তার ইসমাইল হোসেন বলেন, তার বাবার পড়াশোনার প্রতি সবসময়ই আগ্রহ ছিল। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটন এবং সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বে সেই ইচ্ছাকে দীর্ঘদিন বিসর্জন দিতে হয়েছিল। বর্তমানে তিনি নিজে একজন চিকিৎসক, তার স্ত্রীও চিকিৎসক, বড় বোন নার্সিং পেশায় এবং বোনজামাই শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
ইসমাইল হোসেন জানান, বাবার দীর্ঘদিনের পড়াশোনার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। এবার তিনি এসএসসি পাস করেছেন। তাকে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি করানোর পরিকল্পনাও রয়েছে পরিবারের। বাবার এই অনন্য সাফল্যের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
আলী আকবরের এই সাফল্য প্রমাণ করে, শিক্ষা গ্রহণের জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ইচ্ছা, মনোবল ও পরিশ্রম থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।