মানিকগঞ্জের সিংগাইর পৌরসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রমে অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম ইরানি আক্তারের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর ওই টাকা পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তাকে শোকজ করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। আরটিভির হাতে আসা একটি গোপন নথিতেও অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন ও ভাগ-বাটোয়ারার তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সিংগাইর পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডে নতুন স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত এবং বার্ষিক হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের জন্য জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে পৌরসভার ২০ থেকে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠপর্যায়ে এ কাজে অংশ নেন। এ কাজে প্রত্যেকের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা করে ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, জরিপকাজের বিল অনুমোদনের সময় পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকীর ওপর চাপ প্রয়োগ করে অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার বিল সংযুক্ত করেন। পরে ওই অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক খায়রুন্নাহার পপির নজরে এলে তিনি হিসাব যাচাই করেন। এরপর অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি ধরা পড়ে।
পৌরসভার নথিতে দেখা যায়, অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার মধ্যে ৫৫ হাজার টাকা পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তারের নামে এবং বাকি ১৩ হাজার টাকা সাবেক ও বর্তমান হিসাবরক্ষকের নামে উত্তোলন দেখানো হয়েছে। তবে যাদের নামে ওই অর্থ উত্তোলন দেখানো হয়েছে, তাদের দাবি, তারা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না।
সিংগাইর পৌরসভার সাবেক হিসাবরক্ষক আনিসুর রহমানের নামে পাঁচ হাজার টাকা উত্তোলন দেখানো হলেও তিনি জানান, বিলটি পাস হওয়ার আগেই তিনি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া পৌরসভায় বদলি হয়ে যান। তার দাবি, পাঁচ হাজার টাকা তাকে সোলাইমান দিয়েছিলেন এবং তিনি টাকা নিতে চাননি।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক মো. মুকুল মিয়ার নামেও আট হাজার টাকা উত্তোলন দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট ফাইলে তার স্বাক্ষর আগে থেকেই নেওয়া ছিল এবং পরে তিনি জানতে পারেন তার নাম ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন দেখানো হয়েছে।
পৌরসভার কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকীর দাবি, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তারই ৬৮ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা সাবেক হিসাবরক্ষক এবং আট হাজার টাকা বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষকের নামে দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসককে জানালে হিসাব যাচাই করে গরমিল পাওয়া যায়। পরে প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকা পৌর রাজস্ব কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে সিংগাইর পৌরসভায় গিয়ে ইরানি আক্তারকে পাওয়া যায়নি। অফিস কক্ষে না থাকায় তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এর আগে ২০২৫ সালেও ইরানি আক্তারের বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেটের ফি বাবদ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগের পর তা পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তাকে শোকজ করা হয়েছিল।
এদিকে, বর্তমান সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক খায়রুন্নাহার পপি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় ৬৮ হাজার টাকার গরমিল পাওয়া যায়। পরে দেখা যায়, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাস্টার রোল দেখিয়ে ওই অর্থ উত্তোলন করেছেন। তাকে টাকা কোষাগারে জমা দিতে বলা হলে তিনি তা ফেরত দিয়েছেন। এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজন হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।