ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির অস্বস্তি দিন দিন বাড়ছে বলে উঠে এসেছে বিবিসি নিউজ বাংলা ও দ্য ডিপ্লোম্যাটের পৃথক প্রতিবেদনে। দুই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর গত দুই বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাম্প্রতিক অনলাইন সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার সময় দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। সে সময় এই অবস্থান সাময়িক হবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পরও শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এ সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করলেও ভারত সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে, এসব কর্মকাণ্ড তিনি ব্যক্তিগত সক্ষমতায় করছেন এবং এর সঙ্গে ভারতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

তবে গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অনলাইনে শেখ হাসিনার সরাসরি সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্ত হওয়া পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দেয়। ঢাকার পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, ভারতের রাজধানীতে এমন একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হলো।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ বারবার শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার অনুরোধ জানালেও দিল্লির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে দেখানোর কথা বলেছেন। তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক বন্দি নন; ফলে তার ওপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সহজ নয়।

এদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়েও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গঙ্গার পানি চুক্তি থেকে শুরু করে বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা থমকে থাকার পেছনে শেখ হাসিনা ইস্যু বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হলেও ভারত এখনো তাতে সাড়া দেয়নি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের জন্য একসময় আস্থাভাজন বিদেশি মিত্র হিসেবে বিবেচিত শেখ হাসিনা এখন দিল্লির কাছে সম্পদের বদলে ‘বোঝা’ হয়ে উঠছেন কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে শেখ হাসিনার অনড় অবস্থান ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরক্তি তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও দিল্লির অস্বস্তি বাড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগেই উদ্বেগ জানানোর পরও নয়াদিল্লিতে ওই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই আয়োজনকে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাইয়ের আন্দোলনে নিহতদের প্রতি গুরুতর অপমান হিসেবে উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও আবারও জোরালো হয়েছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট বলছে, শেখ হাসিনাকে জোর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়। তবে তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলে দুই দেশের বর্তমান উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে। এ ছাড়া শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারত ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনা করছে—এমন জল্পনাও রয়েছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান শুধু রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে বলে দুই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।