ছেলেকে গুছিয়ে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন মা। পেছন থেকে ছেলের চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। ছেলে ঠিকমতো যাচ্ছে কি না, কোথাও বিপদে পড়ছে কি না—এই দুশ্চিন্তা আজও তার মনে। কারণ, তার ছেলে চোখে দেখতে পান না।
তবে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও জীবনযুদ্ধের কাছে হার মানেননি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের মোখলেসুর রহমান। বরং বৃদ্ধা মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিনই কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।
মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারান মোখলেস। এরপর থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। বর্তমানে বৃদ্ধা মায়ের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠা এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে স্থানীয় একটি কাঠকাটা মিলে কাজ করতে যান।
কাজের সময় গাছের ছাল ছাড়ানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমও করতে হয় তাকে। কখনো ইটের সাহায্যে, কখনো হাতে স্পর্শ করে তিনি কাজ সম্পন্ন করেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও অভিজ্ঞতাই যেন তার পথচলার শক্তি। কাজ শেষে গাছের ছাল সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে মা-ছেলের সংসার।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে একই পথে চলছেন মোখলেস। চোখে দেখতে না পেলেও স্মৃতি আর দায়িত্ববোধ তাকে পথ দেখায়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই দায়িত্ব ও ভালোবাসার কাছে বাধা হতে পারে না।
বর্তমান সময়ে যখন অনেক সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে অনীহা দেখায়, তখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মোখলেসুর রহমান হয়ে উঠেছেন এক অনন্য উদাহরণ। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, চোখে আলো না থাকলেও হৃদয়ে দায়িত্ববোধের আলো থাকলে জীবনের পথ থেমে থাকে না।
রাস্তা দেখতে পান না মোখলেস, কিন্তু দায়িত্বের পথ ঠিকই চিনেছেন। আর সেই পথের শেষ ঠিকানায় রয়েছেন তার প্রিয় মা।