“ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে। বয়স ৬ মাস। ডিমান্ড ২ লাখ টাকা। লোকেশন চট্টগ্রাম।’ না, কোনো জমিজমা কিংবা পুরোনো মোবাইল বিক্রির বিজ্ঞাপন নয় এটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রীতিমতো দর-কষাকষি করে বিক্রি করা হচ্ছে রক্তমাংসের এক একটা জ্যান্ত শিশুকে! সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’, ‘বিশেষ অফারে ছেলে বাবু দত্তক’- ফেসবুকে এমন অদ্ভুত আর স্পর্শকাতর শিরোনামের পাবলিক ও প্রাইভেট গ্রুপের ছড়াছড়ি। যেখানে পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার সদস্যের সক্রিয় উপস্থিতি। কিন্তু ‘দত্তক’ নামের আড়ালে সেখানে আসলে কী চলছে?
এটি কি শুধুই কোনো অসহায় মায়ের আকুতি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক সংঘবদ্ধ শিশু কেনাবেচা ও পাচারকারী চক্র? কীভাবে সমাজ ও আইনের চোখের আড়ালে ফেসবুকের ইনবক্সে আর বিকাশ-নগদে জমে উঠেছে হাজার হাজার টাকার শিশুর হাট? জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক মানসুরা হোসাইন সম্প্রতি অনুসন্ধান করেছেন এই বিষয়টি নিয়ে। সেই সূত্র ধরেই আমরা তুলে ধরবো- কীভাবে সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার বানিয়ে চলছে এই অমানবিক শিশু বাণিজ্য।
ঘটনাটির গভীরতা মাপতে প্রথম আলোর টিম দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কেবল দূর থেকে দেখাই নয়, পরিস্থিতি বুঝতে পরিচয়ের আড়ালে তিন-তিনটি গ্রুপে যোগ দিয়ে ইনবক্স ও মুঠোফোনে শুরু হয় গোপন দর-কষাকষি। আর এই অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক নির্মম বাস্তবতা। দেখা যায়, এক ডজন গ্রুপের প্রায় ২৮৮টি পোস্টের মধ্যে সরাসরি শিশু চেয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছে ৩৪টি, আর শিশু বিক্রির প্রস্তাব এসেছে ৬৩টি পোস্ট থেকে!
পোস্টগুলোর ধরণ দেখলে আঁতকে উঠতে হয়! কেউ লিখেছেন: “আমার একটা ছেলে বাবু চাই, খুব ইমার্জেন্সি দরকার।” কেউ বলছেন: “অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে বাচ্চা লাগবে, বাজেট ৫০ হাজার টাকা।” এমনকি এক নারী শর্ত দিয়েছেন- গর্ভবতী মায়ের সাথে চুক্তি করে সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে সন্তানকে তিনি নিয়ে যাবেন ইতালিতে! আরেকজন অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাওয়ার জন্য চেয়েছেন ‘সুন্দর, ফর্সা, কিউট মেয়ে বাবু’। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো- চাল-ডালের মতো এই বাজারেও রয়েছে চাহিদার তারতম্য! কন্যাসন্তানের চেয়ে ছেলেশিশুর ‘দর’ বা কদর এখানে বহুগুণ বেশি। একটি নবজাতক ছেলের দাম যেখানে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা হাঁকানো হয়, সেখানে মেয়েশিশুর দাম নামানো হয় ১ থেকে দেড় লাখে। গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই শুরু হয় আগাম অর্ডার আর চুক্তি!
তবে এই শিশু কেনাবেচার বাজারে যেমন আছে প্রকৃত বেচাকেনা, তেমনই আছে প্রতারণার মাকড়শার জাল। সন্তান পাওয়ার আকুলতাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির বাটপার হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কুষ্টিয়ার আবদুল আলিমের কথাই ধরা যাক। সন্তান পাওয়ার আশায় ফেসবুকে যোগাযোগ করে তিনি তিন-তিনবার প্রতারিত হয়েছেন! সর্বশেষ এক নারী তাকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে একটি ফুটফুটে নবজাতক দেখায়। বাচ্চার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়ার পর ‘পথখরচা’ বাবদ চাওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। সরল বিশ্বাসে বিকাশে টাকা পাঠানোর সাথে সাথে উধাও সেই ফেসবুক গ্রুপ! ব্লক হয়ে যায় হোয়াটসঅ্যাপের সব নম্বর। আবদুল আলিমের আক্ষেপ- এই চক্রকে থামানোর কেউ নেই!
অনুসন্ধান চলাকালে সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করা হয় চট্টগ্রাম লোকেশনে পোস্ট দেওয়া সেই ‘২ লাখ টাকার ছেলে বাচ্চা’র পোস্টদাতার সাথে। ফোন করার পর জানা গেল, পোস্টদাতা নিজে বাচ্চা বিক্রি করছেন না, তিনি কেবল এক মায়ের হয়ে পোস্ট দিয়েছেন। এরপর তিনি নরসিংদীর এক নারীর নম্বর দেন। সেই নারীকে ফোন দেওয়া হলে তিনি এক লাখ টাকা চান। তার সাফ কথা- “বাচ্চা হতে, পালতে আর প্যাম্পার্স কিনতেই ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে! স্বামী চলে গেছে, পরিবার চালাতে পারছি না, তাই বিক্রি করছি।” অথচ চাওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের নাম বা পরিচয় দেননি। দিয়েছেন একটি টিকাদান কার্ডের ছবি, যেখানে পিতার নাম লেখা অন্য একজনের! অর্থাৎ, পুরো প্রক্রিয়াটিই আচ্ছন্ন এক রহস্য আর অবৈধতার ঘন কুয়াশায়।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- এই শিশুরা আসছে কোথা থেকে? ফেসবুকের স্ক্রিনের পেছনে কার কার হাত রয়েছে? অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি কেবল গুটিকয়েক ব্যক্তির কাজ নয়, এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। একাধিক হাসপাতালের অসাধু কর্মচারী ও দালালেরা ওঁৎ পেতে থাকে। কোনো অসচ্ছল বা অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীর সন্ধান পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এই চক্র। প্রসবের আগ পর্যন্ত সেই নারীর দেখভাল, সিজারিয়ানের খরচ- সব বহন করে দালালরা। সন্তান জন্ম হলেই তাকে তুলে দেওয়া হয় ক্রেতার হাতে, আর দালালেরা পেয়ে যায় মোটা অঙ্কের কমিশন!
ফেসবুকের গণ্ডি পেরিয়ে টাকার বিনিময়ে ‘দত্তক’ দেওয়ার এই ব্যবসা পৌঁছে গেছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপেও! ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁটে পাওয়া গেল নোটিশ- “বাচ্চা দত্তক দিবেন? আমরা নিবো।” ঠিকানা ধরে যাত্রাবাড়ীর একটি কেয়ারগিভিং ফার্মের কার্যালয়ে গিয়ে জানা গেল বিস্ফোরক তথ্য! তারা নিজেদের ‘কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান’ দাবি করে ৫০ হাজার টাকা ফি নিয়ে সন্তানদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। স্ট্যাম্প পেপারে এফিডেভিট বানিয়ে আইনি কোনো ভিত্তি ছাড়াই শিশু হস্তান্তর করে তারা হাত ধুয়ে ফেলে! অর্থাৎ, কোনো নজরদারি বা আইনি অনুমোদন ছাড়াই টাকার খেলায় হাতবদল হয়ে যাচ্ছে একেকটি শিশুর জীবন!
এখানে একটি আইনি সত্য জানা দরকার- বাংলাদেশে কিন্তু সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ বা ‘সিভিল’ দত্তক আইন নেই! মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি ‘দত্তক’ গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। অন্য ধর্মে ধর্মীয় বিধানে দত্তকের নিয়ম থাকলেও, ধর্মনির্বিশেষে কেবল ‘পারিবারিক আদালত’ বা সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘ছোটমণি নিবাস’-এর মাধ্যমে আইনি অভিভাবকত্ব (Legal Guardianship) নেওয়া যায়। কিন্তু ফেসবুক বা কোনো এজেন্সির মাধ্যমে টাকা দিয়ে শিশু কেনাবেচা- আইনত সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ!
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদার মতে- ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারা এবং ২০২৬ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, অসৎ উদ্দেশ্যে শিশু কেনাবেচা বা হস্তান্তর করা কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা কোনটা জানেন? এই অসাধু প্রক্রিয়ায় টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া শিশুরা পরবর্তীতে কোথায় যাচ্ছে? তাদের কি কোনো নিঃসন্তান দম্পতি লালন-পালন করছে, নাকি তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে শিশু শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি, অঙ্গ পাচার কিংবা যৌন শোষণের মতো মারাত্মক অপরাধে? সরকারের কোনো দপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এর কোনো ট্র্যাকিং বা হিসাব নেই!
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ডিবির সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম স্বীকার করেছে যে, ফেসবুকে এমন প্রতারণা বা বেচাকেনার বিষয়ে তারা অবগত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত এই চক্রগুলোকে থামানো বা আইনের আওতায় আনার শক্ত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সন্তান পাওয়ার আকুলতা এক মানবিক অনুভূতি, আর দারিদ্র্য বা সংকট এক কঠিন বাস্তব। কিন্তু এই দুইকে পুঁজি করে যখন মানুষের সন্তানকে হাটের পণ্যের মতো দরদাম করা হয়- তখন তা পুরো সমাজব্যবস্থার মুখে এক বিরাট চড় মারার সামিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনই লাগামছাড়া হওয়ার আগেই তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক নজরদারি অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় প্রতিটি অ্যাডপশন গ্রুপ ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে র্যাপিড সাইবার অ্যাকশন। ২. সর্বজনীন দত্তক নীতিমালা অর্থাৎ সরকারি উদ্যোগে সহজ, স্বচ্ছ এবং আইনি কাঠামোর অধীনে ‘দত্তক প্রক্রিয়া’ তৈরি করা, যেন নিঃসন্তান দম্পতিরা অনৈতিক পথের বদলে আইনি পথ বেছে নিতে পারেন। ৩. সামাজিক সচেতনতা অর্থাৎ ফেসবুকে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে বা চুক্তিতে বাচ্চা কেনার নামে যে বড় ধরনের পাচার বা প্রতারণার ফাঁদ পাতা রয়েছে, তা নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা।