ভারতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশে নাশকতার একটি বহুমুখী পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গোয়েন্দা ও পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দিল্লিতে হাসিনার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত কয়েকটি বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সূত্রের দাবি, গত ২৪ ও ৩১ জুলাই দিল্লিতে হাসিনার বাসভবনে দুই দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈঠকগুলোতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন নাশকতা, রাজনৈতিক সংঘাত উসকে দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর নানা কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য অস্থিরতার পরিকল্পনাটি কয়েকটি স্তরে বাস্তবায়নের চেষ্টা হতে পারে। এর মধ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি ঢাকার অপরাধজগতের সশস্ত্র ব্যক্তিদের ব্যবহার করে টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উগ্রবাদী তরুণদের ব্যবহার করে বিস্ফোরণ ঘটানো এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও শিক্ষক সংগঠনের স্বাভাবিক আন্দোলনকে বৃহত্তর সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের আরও দাবি, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঘিরেও অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার ছদ্মবেশে সংঘর্ষে ঢুকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরির পরিকল্পনার কথাও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে জঙ্গি সংগঠন জেএমবিকে ব্যবহার করে নতুন করে উগ্রবাদী তৎপরতা চালানোর একটি পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার দাবিও করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের দাবি, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে পুরোনো জঙ্গি নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। এ পরিকল্পনায় কয়েকজন পলাতক ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন বলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, চলতি আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গোপন সেলকে মাঠে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে আগুন ও ভাঙচুরের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ১৫ আগস্টকে ঘিরে ধানমন্ডি ৩২ ও টুঙ্গিপাড়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শিক্ষকদের আন্দোলনকেও সম্ভাব্য অস্থিরতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ সদর দপ্তর। সূত্রের দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি ও প্রশাসনিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের জমায়েত তৈরি করে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় একটি শিক্ষক চক্রের ভূমিকা নিয়েও নজরদারি চলছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি গোপন অনলাইন গ্রুপকে ঘিরেও গোয়েন্দা তৎপরতা চলছে বলে সূত্রের দাবি। ওই গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ দাবিরও স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।
সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশ, র্যাব ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। থানা, পুলিশ লাইনস ও অফিস কম্পাউন্ডে থাকা যানবাহনের নিরাপত্তা জোরদার এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর বিশেষ নজর রাখতে বলা হয়েছে।
পুলিশের মুখপাত্র সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় সতর্ক রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় ও এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। সম্প্রতি মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোও তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।