বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ককে ইতিবাচক, স্থিতিশীল ও জনকেন্দ্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে শিগগির ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগেই তার এ দ্বিপক্ষীয় সফর হতে পারে। তবে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজে অংশ না নিয়ে প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নয়াদিল্লি সফরের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গত দুই বছরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখে সম্পর্ক পুনর্গঠনে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জাপানসহ কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। এরই মধ্যে তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এবার ভারত সফর হলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে শীতল হয়ে পড়ে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর তাকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়ে। ভিসা কার্যক্রমে বিধিনিষেধ, বাণিজ্যিক বাধা, সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যু এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়।

এর মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা এবং দুই দেশের বাণিজ্যে বিভিন্ন বিধিনিষেধ সম্পর্কের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেন এবং তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। তার শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরির উপস্থিতিকেও সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করেন। এরপর ধাপে ধাপে ভিসা কার্যক্রম চালু, যাত্রীবাহী বাসসেবা পুনরায় শুরু এবং জ্বালানি সংকটের সময় ভারত থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের মতো সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ সামনে আসে। জুনে মন্ত্রী পদমর্যাদায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়াকেও সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ফরেন করসপন্ডেন্ট ক্লাব আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অনুষ্ঠানটি বেসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এবং এতে ভারত সরকার কোনোভাবে জড়িত ছিল না।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। পরে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়।

বৈঠক শেষে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশ একসঙ্গে বসলে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা সমাধান করা যায় না। উভয় দেশের জন্য লাভজনক সমাধান খুঁজে বের করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, দুই দেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি—ভালো সম্পর্ক।

এরপর দিল্লি সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। সাধারণ মানুষের স্বার্থকে কেন্দ্র করে গঠনমূলকভাবে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনাও চান তিনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশ নেওয়ার চেয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় সফর বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশি কার্যকর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি সরাসরি বৈঠকে বসলে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, তিস্তা ইস্যু, বাণিজ্যিক বাধা দূর করা, দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ সহজ করা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সে ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর সফল হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার পথ আরও সুগম হতে পারে।